সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক মুসলিম সমাজের সুপরিচিত ইসলামী দাঈ, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ও মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ এবিএম শাহাবুদ্দীন ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গত ২২ জুলাই সিডনির লাকেম্বার ম্যাকডোনাল্ড স্ট্রিটে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
পারিবারিক সূত্র মতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং সম্প্রতি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী শাহাবুদ্দীন জীবনের শেষ অধ্যায় কাটিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়, যেখানে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ইসলামী দাওয়াহ, মানবকল্যাণ ও কমিউনিটি উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
কিভাবে হলেন প্রকৌশলী থেকে ইসলামী দাঈঃ
এবিএম শাহাবুদ্দীন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Bangladesh University of Engineering and Technology (BUET) থেকে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের দিকে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পেশাগত জীবনে সফলতা অর্জনের পাশাপাশি তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ইসলামের দাওয়াহ, নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করেন।
মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়ার কথাঃ
সিডনির লাকেম্বাকে কেন্দ্র করে তাঁর দাওয়াহ কার্যক্রম ধীরে ধীরে সমগ্র অস্ট্রেলিয়ায় বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি আরব, পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফ্রিকান, তুর্কি, সোমালি ও অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটির মধ্যেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সম্মানিত।
তাঁর পরিচয় ছিল একজন বিনয়ী, অমায়িক ও প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে। ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন, তরুণ প্রজন্মের নৈতিক বিকাশ, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও তিনি নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিতেন। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা ও আস্থার প্রতীক।
শেষ বিদায়ে জনসমুদ্র
২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার সিডনির অবার্নে অবস্থিত ওমর মসজিদে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সিডনি ছাড়াও ক্যানবেরা, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড, ডারউইনসহ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি, আলেম, কমিউনিটি নেতা ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
জানাজা শেষে তাঁকে রুকউড জেনারেল কবরস্থানের মুসলিম অংশে দাফন করা হয়। উপস্থিত অনেকেই বলেন, মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সেবার প্রতিদান হিসেবেই এত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার এক অনন্য প্রকাশ।
দাওয়াহর পথে আজীবন নিবেদিত
ইসলামী পরিভাষায় ‘দাঈ’ অর্থ এমন ব্যক্তি, যিনি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সুন্দর চরিত্র ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেন। এবিএম শাহাবুদ্দীনের জীবন ছিল এই আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের হৃদয় জয় করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো উত্তম চরিত্র, সহমর্মিতা এবং আন্তরিক আচরণ ।
হয়েগেল কমিউনিটির অপূরণীয় ক্ষতি
তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ইসলামী ও সামাজিক সংগঠন, আলেম, কমিউনিটি নেতা এবং সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাঁর স্মৃতিচারণ করে লেখেন, তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের ব্যক্তিত্ব, বিনয়, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন।
কমিউনিটি নেতাদের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামী দাওয়াহ, বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং মুসলিম সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এবিএম শাহাবুদ্দীনের অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মের জন্য আদর্শ, আর তাঁর কর্ম সমাজের জন্য এক মূল্যবান উত্তরাধিকার।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
* নাম: এবিএম শাহাবুদ্দীন
* জন্ম: ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮, বাংলাদেশ
* ইন্তেকাল: ২২ জুলাই ২০২৬, লাকেম্বা, সিডনি
* বয়স: ৭৮ বছর
* পেশা: প্রকৌশলী, ইসলামী দাঈ ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব
* শিক্ষা: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
* অভিবাসন: প্রায় ১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু
* জানাজা: ওমর মসজিদ, অবার্ন, সিডনি
* দাফন: রুকউড জেনারেল কবরস্থান, মুসলিম সেকশন
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
ছবি: সংগৃহীত
তথ্যসূত্র: টিম প্রেস অস্ট্রেলিয়া (বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান জার্নালিস্টস গ্রুপ)