মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার বিজয়ের দিন।
ভাষণের শুরুতে রাষ্ট্রপতি জুলাই অভ্যুত্থানের সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, সজল, রাব্বি, মেরাজ, এনাম, তাইম, নাইমা, শিশু রিয়াকব ও আহাদসহ আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সকালে জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন দেখা গেলেও বিকালের অনুষ্ঠানে যে বিশৃঙ্খলা হয়েছে, তা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক।
এর আগে অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপির নেতাকর্মীরা একটি ভিডিও ডকুমেন্টরি ইস্যু নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে হট্টগোল শুরু করেন। যা চলে দীর্ঘসময় ধরে। সেখানে থাকা সরকারের মন্ত্রীরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। এসময় আতঙ্কিত হয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশি অতিথিরা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতি হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ভুল তো মানুষ করেই। ডকুমেন্টারিতে ভুল হয়েছে। সেখানে আবু সাঈদের ছবিই ছিল না, অথচ তিনি এই বিপ্লবের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও ছিল না। মাননীয় মন্ত্রী বারবার ক্ষমা চেয়েছেন। এরপরও জাতীয় অনুষ্ঠানে ওয়াকআউট বাঞ্ছনীয় নয়।’
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘বিদেশি অতিথিদের সামনে আমরা যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এই ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবে যিনি পাশের দেশে বসে আছেন। ভবিষ্যতে আমাদের এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, সকালের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে পাশে বসিয়ে সম্মান জানিয়েছেন। এ ধরনের পারস্পরিক সম্মানই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়া উচিত।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। হাওয়া থেকে উড়ে এসে এখানে বসিনি। এই সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার। ভুল হলে আমরা সংশোধন করব, মাসুলও দেব। কিন্তু সবাই মিলে ভুল শুধরে নিতে হবে।’
জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মন খারাপ করবেন না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধারাও অনেক কিছু পাননি। আপনারাও হয়তো সবকিছু পাবেন না, কিন্তু এই সরকারের কাছ থেকে সম্মান অবশ্যই পাবেন। দেশের সামর্থ্য অনুযায়ী সবকিছু উজাড় করে আপনাদের পাশে দাঁড়ানো হবে।’
তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সরকারের “সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব”।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না। এত অন্যায়, অবিচার, খুন, গুম, মানি লন্ডারিং ও নির্যাতনের পরও তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। আবার দেশে ফিরে আসার কথাও বলা হচ্ছে। আসুন, দেশে আসুন, রাজপথে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।’
নিজের রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের জন্য আবারও করব। এই ধরনের বাংলাদেশ দেখার জন্য আমরা যুদ্ধ করিনি।’
তিনি বলেন, আবু সাঈদের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সাহস পৃথিবীর খুব কম জাতির আছে। “আমরা সেই সাহসী জাতি, এটি আমাদের গর্ব।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে। মতের ভিন্নতা থাকলেও জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিভাজন, বিদ্বেষ ও সংকীর্ণ স্বার্থ যেন দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ ছিল, তেমনি জুলাইয়ের যুদ্ধও ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। নির্বাচন গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশে যতদিন গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, ততদিন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে।’
ভাষণের শেষদিকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ নয়, রাষ্ট্রপতির চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আমি ক্ষুদ্র মানুষ। কিন্তু একটি বড় চেয়ারে বসে আছি। আমার জন্য নয়, এই চেয়ারের মর্যাদা এবং বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’
সবশেষে রাষ্ট্রপতি মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় ঐক্য, দেশপ্রেম, সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।