• শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় নতুন উপসর্গ ৮১৮ জনের ভিসা নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের জরুরি বার্তা জুলাই গণ অভ্যুত্থান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাফর ইকবাল আসামি একযোগে ডিএমপির ১২ কর্মকর্তাকে বদলি যে পাঁচ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নতুন সচিব পেল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, ভোটগ্রহণ ২০ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণা সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্ব – খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী প্রদানকারী সাবেক যুগ্ম সচিব সৈয়দ জগলুল পাশা গ্রেপ্তার স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ৫ আগস্ট কীভাবে আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ হয়ে উঠল

কবি আল মুজাহিদী: আমাদের ‘ধুবড়িয়ার জামাই’কে শ্রদ্ধা

সাগর চন্দ্র দাস
প্রকাশকাল : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অঙ্গনে নীরবে, নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের অবদান প্রচারের আলোয় খুব বেশি না এলেও তাঁদের কর্ম ও সৃষ্টির দীপ্তি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে আলোকিত করে। কবি আল মুজাহিদী ছিলেন তেমনই একজন প্রজ্ঞাবান সাহিত্যসাধক, নিষ্ঠাবান সাংবাদিক, সংস্কৃতিবান ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ।

তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যসাধনা, পেশাগত সততা এবং সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন কবির বিদায় নয়; বরং বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং সংস্কৃতিচর্চার একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান।

তবে তার চিন্তা, কর্ম, সৃজনশীলতা এবং মানবিক আদর্শ বেঁচে থাকে পাঠকের হৃদয়ে, সমাজের স্মৃতিতে এবং ইতিহাসের পাতায়।

১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার নারুচি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মুজাহিদী। তাঁর পিতা আবদুল হালিম জামালী এবং মাতা সাখিনা খান ছিলেন ধর্মপ্রাণ, শিক্ষানুরাগী ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তিনি সততা, শিষ্টাচার, মানবিকতা এবং জ্ঞানার্জনের অনুপ্রেরণা লাভ করেন।

গ্রামীণ জনপদের প্রকৃতি, মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন, লোকজ সংস্কৃতি এবং সামাজিক বাস্তবতা তাঁর সংবেদনশীল মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাই তাঁর সাহিত্যকর্মে গ্রামীণ জীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুষঙ্গগুলো বারবার ফিরে এসেছে।

আল মুজাহিদী ১৯৫৮ সালে ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬০ সালে করটিয়া সাদত কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসে। ১৯৬৬ সালে সমাজবিজ্ঞানে এবং ১৯৬৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তিনি নিজেকে বহুমাত্রিক চিন্তা ও গবেষণার জগতে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সমাজবিজ্ঞানের বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলা সাহিত্যের নান্দনিক চেতনার সমন্বয় তাঁর সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় একটি স্বতন্ত্র মাত্রা যোগ করেছিল। কবি আল মুজাহিদী সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ সময় তিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাকে সাহিত্য সাময়িকীর দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি সংবাদপত্রকে কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন। অনেক নবীন কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক তাঁর উৎসাহ, পরামর্শ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্যজগতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি ছিলেন নতুন প্রতিভা আবিষ্কার ও লালনের একজন নিরলস কারিগর।

কবি আল মুজাহিদীর সাহিত্যসাধনা ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, গবেষণা গ্রন্থ, প্রবন্ধ এবং শিশুসাহিত্যে সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর লেখায় প্রধানত উঠে এসেছে- মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ; সামাজিক অসাম্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; দেশপ্রেম ও সাংস্কৃতিক চেতনা; লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ; নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিকতার জয়গান। তাঁর সাহিত্যকর্ম কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; বরং সমাজকে ভাবতে শেখানোর এক অনন্য প্রয়াস।

খ্যাতিমান সাহিত্যিক হয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিরহংকারী। মানুষের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ছিল আন্তরিক, উষ্ণ এবং শ্রদ্ধাপূর্ণ। সাহিত্যাঙ্গনে তিনি কখনও বিভাজনের রাজনীতিতে জড়াননি। বরং তিনি সকলকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। নবীনদের উৎসাহ দেওয়া, সহকর্মীদের সম্মান করা এবং সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ তৈরি করা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সাংবাদিকতার সূত্রে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কবি আল মুজাহিদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার। তবে

তার ব্যক্তিজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন বিষয় হলো- তিনি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধুবড়িয়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই সূত্রে তিনি “ধুবড়িয়ার গর্বিত জামাই” হিসেবেও নাগরপুরবাসীর কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। এই নাগরপুর আমার জন্মভূমি। ধুবড়িয়ার জামাই হিসেবে তিনি নাগরপুরের মানুষের সঙ্গে গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক যোগাযোগ তাঁকে এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে।

নাগরপুরের অনেক মানুষ আজও তাঁকে স্মরণ করেন একজন বিনয়ী, সংস্কৃতিবান এবং আত্মীয়তাপূর্ণ মানুষ হিসেবে। একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক হয়েও তিনি কখনও তাঁর শ্বশুরবাড়ির এলাকার মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেননি। বরং “ধুবড়িয়ার জামাই” পরিচয়টি তিনি স্নেহ, ভালোবাসা ও আত্মিক বন্ধনের মর্যাদায় ধারণ করেছিলেন।

জীবনের শেষ পর্যায়ে কবি আল মুজাহিদী দীর্ঘদিন কিডনি রোগ, হৃদরোগ এবং বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। শারীরিক কষ্ট তাঁকে কখনও মানসিকভাবে ভেঙে দিতে পারেনি। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজের খোঁজখবর রাখতেন। তাঁর ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ছিল সত্যিই অনুকরণীয়।

দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল শুক্রবার (১৯ জুন) রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং সংস্কৃতির অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একজন কবি, গবেষক, সম্পাদক, সংস্কৃতিসেবী এবং ধুবড়িয়ার গর্বিত জামাই হিসেবে তিনি মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন।

মহান আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা- তিনি যেন কবি আল মুজাহিদীর সকল গুনাহ মাফ করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, শুভানুধ্যায়ী, পাঠক এবং নাগরপুর-ধুবড়িয়াবাসীকে এই শোক সইবার শক্তি দান করেন।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category