জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদারকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্তের ১২ দিনের মাথায় পুনর্বহাল করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলায় অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা পরিচালনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ৯ এপ্রিল যে কর্মকর্তা নিজ স্বাক্ষরে তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিলেন, ২২ এপ্রিল তিনিই আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার কথা উল্লেখ করে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের নথি অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল সচিব মো. শহীদুল হাসান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির ‘প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে’। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, এ অবস্থায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা সমীচীন। পরে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৯(১) এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ১২ অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তকালীন তাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সংযুক্ত রাখার কথাও বলা হয়।
তবিবুর রহমান তখন ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি (১ম সংশোধিত)’ এবং ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
কিন্তু এর ১২ দিন পর, ২২ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের আরেকটি প্রজ্ঞাপনে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলা নং-০১/২০২৬-এ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’।
অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে আগের প্রকল্পগুলোর প্রকল্প পরিচালক পদে পুনর্বহাল করা হয়। একই সঙ্গে বরখাস্তকালীন সময়কে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
দুটি প্রজ্ঞাপনেই স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হিসেবে মো. শহীদুল হাসানের স্বাক্ষর রয়েছে।
এই দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে মাত্র ১২ দিনের ব্যবধান হওয়ায় তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান সামি। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি ৯ এপ্রিল ও ২২ এপ্রিলের দুটি প্রজ্ঞাপন তুলে ধরে জানতে চেয়েছেন, এই সময়ের মধ্যে কী এমন ঘটেছে যে, প্রথমে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়ে একজন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো, আবার ১২ দিন পর একই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে তাকে পুনর্বহাল করা হলো।
তবে ৯ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল এবং ২২ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে কোন প্রক্রিয়ায় সেই অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’ বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দুই প্রজ্ঞাপনে দেওয়া হয়নি।
তবে এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গতবছর নির্বাহী প্রকৌশলী তবিবুর রহমান তালুকদারের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ১ হাজার ৮৮২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের দায়িত্বে থাকার পর তাকে প্রায় ১ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের আরেকটি ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের দায়িত্ব একই কর্মকর্তার হাতে থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেসময় তার বিরুদ্ধে প্রকল্পের টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল ছাড় এবং কমিশন নেওয়ার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের নথিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয় এবং ৯ এপ্রিল ২০২৬ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে মাত্র ১২ দিন পর, ২২ এপ্রিল, একই বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি উল্লেখ করে তাকে পুনর্বহাল করা হয়।