• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৫৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী প্রদানকারী সাবেক যুগ্ম সচিব সৈয়দ জগলুল পাশা গ্রেপ্তার স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ৫ আগস্ট কীভাবে আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ হয়ে উঠল শনির আখড়ায় ১০ হাজার ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু ‘বিদেশি অতিথিদের সামনে নাস্তানাবুদ হওয়া আমাকে ব্যথিত করেছে’ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর: প্রধানমন্ত্রী সিডনির মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা: ইন্দোনেশীয় মুসলিম নারী নূরহায়াতি নিহত, বাংলাদেশি মাহবুবুল হক এখনও লাইফ সাপোর্টে অসুস্থ ইলিয়াস কাঞ্চন, কী হয়েছে তাঁর? দেশে ফিরলেন ১৫ মাস পর এমবাপ্পে কি আসছেন ঢাকায়? যা জানালেন প্রতিমন্ত্রী

খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধ

ইকবাল আলমগীর
প্রকাশকাল : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ব্যাংকিং কৌশল, তবে সফলতার চাবিকাঠি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত বিশেষ ‘এক্সিট’ সুবিধা দেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা—খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loans) হ্রাসে একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা অনেক ঋণ সুদ, জরিমানা এবং আইনি জটিলতার কারণে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েন এবং ব্যাংকও প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করতে পারে না। এর ফলে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ মূলধন আটকে থাকে, নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে যায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ এক্সিট সুবিধা কোনো ঋণ মওকুফ কর্মসূচি নয়; বরং দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণকে অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত উপায়ে নিষ্পত্তি করার একটি ব্যাংকিং কৌশল। যদি ব্যাংক পুরো দাবির পরিবর্তে অন্তত মূল অর্থ বা গ্রহণযোগ্য সমঝোতার ভিত্তিতে একটি যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করতে পারে, তবে সেটি বছরের পর বছর আদায়-অযোগ্য ঋণ বহন করার চেয়ে অধিক লাভজনক। এতে খেলাপি ঋণ কমে, প্রভিশনিংয়ের চাপ হ্রাস পায়, মূলধনের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য নতুন ঋণ প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এ ধরনের ব্যবস্থা বিশ্বের অনেক দেশেই প্রচলিত। One Time Settlement, Loan Settlement, Compromise Settlement, Debt Resolution এবং Distressed Asset Resolution-এর মতো কাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অচল ঋণ নিষ্পত্তি করা হয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বাস্তবসম্মতভাবে আর পুরো অর্থ আদায় সম্ভব নয় এমন ঋণ অনির্দিষ্টকাল ব্যালান্স শিটে বহন করার পরিবর্তে অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা ব্যাংক, আমানতকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অধিক উপকারী। আর্থিক সংকটের পর অনেক দেশ এই ধরনের নীতির মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।

তবে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম অনুশীলনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, সমতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। এই সুবিধা শুধুমাত্র প্রকৃত আর্থিক সংকটে পড়া কিন্তু ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের আন্তরিকতা রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ইচ্ছাকৃত খেলাপি, প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ গ্রহণকারী, সম্পদ গোপনকারী কিংবা প্রভাব খাটিয়ে ঋণ পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য এটি কোনোভাবেই পুরস্কারে পরিণত হওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই নীতির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। অতীতে অনেক সৎ, নৈতিক ও পেশাদার ব্যাংকার বাণিজ্যিকভাবে যৌক্তিক হলেও সুদ মওকুফ বা সমঝোতার ভিত্তিতে ঋণ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কারণ, ভবিষ্যতে সরকার বা প্রশাসনিক পরিবেশ পরিবর্তনের পর তাঁদের সিদ্ধান্ত নিরীক্ষা, তদন্ত বা আইনি পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে—এমন আশঙ্কা অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান ছিল। ফলে অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তও অনেক সময় নেওয়া সম্ভব হয়নি এবং অনাদায়ী ঋণ বছরের পর বছর ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে থেকে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিমালা সেই অনিশ্চয়তা দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এটি পরিচালনা পর্ষদ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনাকে একটি নীতিভিত্তিক ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো প্রদান করতে পারে। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে যথাযথ নথিভুক্ত, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক, স্বাধীন পেশাগত মূল্যায়নের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরীক্ষায় টিকে থাকার মতো শক্তিশালী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিশেষ সুবিধা কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা, ব্যক্তিগত সুপারিশ, প্রশাসনিক চাপ বা প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে না। একই ধরনের পরিস্থিতিতে সকল যোগ্য ঋণগ্রহীতার জন্য একই নীতি প্রয়োগ করতে হবে। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনআস্থাও অক্ষুণ্ণ থাকবে।

সর্বোপরি, একটি কার্যকর এক্সিট নীতি কেবল খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য নয়; এটি ব্যাংকের মূলধন পুনরুদ্ধার, নতুন ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার। সুশাসন, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category